ইউএনওর বাসায় হা’মলার ঘটনায় আ.লীগ-ছাত্রলীগের ১৩ নেতাকর্মী আটক!

বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনে হা’মলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ১৩ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল ইসলাম।

ওসি বলেছেন, ‘আমরা একটি অভিযোগ পেয়েছি। নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে ১৩ জনকে আটক করেছি।’

থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান মাহমুদ বাবু, ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন ফিরোজ, ছাত্রলীগের সহসভাপতি অলিউল্লাহ অলি, ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ১৩ জন।

এ ছাড়া হামলার ঘটনায় জড়িত অন্যদের আটক করতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন নুরুল ইসলাম।

এর আগে ইউএনও মুনিবুর রহমানের ওপর হা’মলাচেষ্টার অভিযোগে আনসার সদস্যদের গু‌লি‌ এবং পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের সংঘ’র্ষে পাঁচ জন গু’লিবিদ্ধসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহও আঘাত পান বলে দাবি করেছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিন পুলিশ ও দুই আনসার সদস্য রয়েছেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গতকাল বুধবার রাত ১১টার পর এসব ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।

এরপরই নথুল্লাবাদ ও রুপাতলী বাস টার্মিনালে এলোপাতাড়ি বাস ফেলে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেন মেয়রের অনুসারীরা। এর ফলে বরিশাল ও দক্ষিণাঞ্চলের ছয় জেলাসহ পায়রা বন্দর এবং পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

এ ছাড়া, মেয়রের অনুসারীরা আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অভ্যন্তরীণ এবং দূরপাল্লার লঞ্চ চলাচলও বন্ধ করে দিয়েছেন। বরিশাল থেকে বের হওয়া ও ঢোকার সব পথ অ’বরোধ করায় কার্যত অব’রুদ্ধ হয়ে পড়েছে বরিশাল। গন্তব্যে যেতে না পেরে চরম দু’র্ভোগে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকনের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘ব‌রিশাল সদর উপ‌জেলা ইউএনওর কার্যাল‌য় কম্পাউন্ডে গতকাল বুধবার রা‌তে ব্যানার খুল‌তে যান নগর ভবনের কর্মচারীরা। এ সময় বাসভবন থেকে বের হয়ে ব্যানার খোলার কারণ জানতে চাওয়ায় শুরুতে ইউএনও মু‌নিবুর রহমানের সঙ্গে সি‌টি কর‌পো‌রেশ‌নের প্রশাস‌নিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দা‌সের কথা কাটাকা‌টি হয়।’

উপজেলা কমপ্লেক্সে ইউএনওর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন আনসার সদস্য জানান, কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ব্যানার খোলার কথা বলে কম্পাউন্ডে আসা ২৫ থেকে ৩০ জন ইউএনওর বাসভবনে ঢুকে তাঁকে ঘিরে ফেলেন। এ সময় ইউএনওকে রক্ষায় এগিয়ে গেলে তাঁদের সঙ্গে আনসার সদস্যদের হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে হা’মলা চালানো হলে আনসার স‌দস্যেরা গু’লি ছোড়েন। এতে দুই থেকে তিন জন গু’লিবিদ্ধ হন।

খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগর পরিষদের বেশ কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর গুলি করার খবর শুনে কয়েকশ নেতাকর্মীও জড়ো হন সেখানে। তাঁদের নিয়ে মেয়র উপজেলা কমপ্লেক্সে ঢুকতে গেলে দ্বিতীয় দফায় ভেতর থেকে গু’লি ছোড়েন আনসার সদস্যেরা। গু’লির মুখে ভেতরে ঢুকতে না পেরে কমপ্লেক্সের বাইরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে অবস্থান নেন মেয়র সাদিক। দ্বিতীয় দফায় গু’লিবর্ষণেও দুই থেকে তিন জন গু’লিবিদ্ধ হন। ছাত্রলীগ কর্মীরা এ সময় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধসহ একটি বাস ভা’ঙচুর করেন। পরে মেয়র ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।

উপজেলা কমপ্লেক্সে এসব ঘটনার মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ। বাস ভা’ঙচুরসহ সড়ক অবরোধ ঠেকাতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সেখানে থাকা ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের ঘণ্টাব্যাপী ধা’ওয়া-পা’ল্টাধাওয়া হয়। এতে পুলিশসহ আহত হন অন্তত ৩০ জন। এক পর্যায়ে পিছু হটেন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা। এর মধ্যেই নগর ভবনের বেশ কয়েকটি ময়লা ফেলার গাড়ি এনে এ’লোপাতাড়ি ফেলে রেখে অবরোধ করা হয় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক। এ সময় মহাসড়কে ফেলা হয় বর্জ্য। ফলে বন্ধ হয়ে যায় যানবাহন চলাচল। পরে দিবাগত রাত ৩টার দিকে অবরোধ তুলে নিলে আবারও যানবাহন চলাচল শুরু হয়।

গু’লিবিদ্ধ হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা শাহ‌রিয়ার বাবু, হারুন অর র‌শিদ ও তানভীরকে ব‌রিশাল শের-ই-বাংলা মে‌ডি‌কেল ক‌লেজ হাসপাতালে ভ‌র্তি করা হয়েছে। পরে অবস্থার অবনতি হলে তানভীরকে ঢাকায় পাঠানো হয়।

ইউএনও মুনিবুর রহমান বলেন, ‘রাত সাড়ে ১০টার দিকে আট থেকে ১০টি মোটরসাইকেলে করে ১৫ থেকে ২০ জন আমার উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে ঢুকে ঘোরাফেরা করছিল। এখানে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা জোর করে আমার ঘরে ঢুকে পড়ে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রাজীব নামের এক ছাত্রলীগ নেতা। তিনি নিজেই তাঁর পরিচয় দিয়েছেন। পরে আনসার সদস্যেরা তাদের বের করে দেন। এরপরই ৬০ থেকে ৭০ জন যুবক হঠাৎ করে আমার বাসার ভেতরে ঢোকার পর দোতলায় উঠে আসেন। আমি কারণ জানতে চাইলে তাঁদের একজন নিজেকে মাহমুদ হাসান বাবু এবং আরেকজন সাজ্জাদ সেরনিয়াবাত বলে পরিচয় দেন এবং দুজনেই আওয়ামী লীগ নেতা বলে জানান। তাঁরা আমাকে উঠিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় আনসার সদস্যেরা আমার প্রাণ বাঁচান। এরপর কয়েকশ লোক এসে কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। তারা গেট ভেঙে ফেলাসহ অনেক ক্ষতিসাধন করেছে।’

পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ তার বাসভবনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বিসিসির কর্মীরা সেখানে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন। অথচ তাঁদের ওপর ন্যাক্কারজনকভাবে গু’লি চালানো হয়েছে। ঘটনা সর্ম্পকে জানতে সেখানে গেলে আমার ওপরও গু’লি চালানো হয়। আমার বহু নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন, গু’লিবিদ্ধ হয়েছেন। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই, বিচার চাই। এভাবে তো দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।’

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *