বঙ্গবন্ধু এবং প্রেসিডেন্ট জোভেনেলের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড

বঙ্গবন্ধু এবং প্রেসিডেন্ট জোভেনেলের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড

১৫ আগস্ট! বাংলাদেশের জাতীয় শোক দিবস এবং বিশ্বের ইতিহাসে একটি মর্মন্তুদ কালো দিন! এই দিন হানাদার পাকিস্তানের বাংলাদেশী দোসররা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস সবারই জানা। কয়েকদিন আগে, জুলাই মাসের ৭ তারিখে গভীর রাতে ক্যারিবিয়ান দেশ হাইতির প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইজকে হত্যা করা হয়। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য কোনভাবেই বঙ্গবন্ধু এবং জোভেনেলের তুলনা করা নয় এবং তা উচিতও নয়, কারণ বঙ্গবন্ধুর মত বিশাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং জাতির জনকের সংগে বিশ্বের কোন নেতার তুলনা হতেই পারে না। ১৯৭৩ সালে ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি’।

দেশপ্রেম, স্বাধীনতা আন্দোলনে আপোষহীন নেতৃত্ব, জীবনের একটি বিশাল সময় জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থাকা, অনিন্দ্যসুন্দর ঋজু একহারা অতিশয় লম্বা গড়ন, অসাধারণ বাগ্মিতা এবং সর্বোপরি তার মত উদাত্ত কণ্ঠ পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোন নেতার ছিল বা আছে বলে মনে হয় না। দু’জন আজ জীবিত থাকলে এবং পাশাপাশি দাঁড়ালে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কাছে জোভেনেল ম্রিয়মাণ হয়ে যেতেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই বলে মানুষ এবং রাষ্ট্রনেতা হিসেবে প্রেসিডেন্ট জোভেনেলকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে তাও নয়।

কিন্তু যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, একজন রাষ্ট্রনেতা যেমনই হোক, তাকে হত্যা করা মানব সভ্যতায় কখনোই কাম্য হতে পারে না। এই দুই হত্যাকাণ্ডের সাদৃশ্য, বৈপরীত্য এবং বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ঘটনাবলীর দিকে এ নিবন্ধে বিশেষভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়েছে, কোনভাবেই দুই রাষ্ট্রপ্রধানের দর্শন, শাসনকাল বা ব্যক্তিত্ব নিয়ে তুলনার অশোভন চেষ্টা করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা, তার জন্যই আজকের বাংলাদেশের অভ্যুদয়, তার তুলনা তিনি নিজেই।

এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্পর্কে কারোরই তেমন অজানা কিছু নেই, কিন্তু ক্যারিবিয়ান দেশ হাইতি সম্পর্কে তেমন একটা জানা না থাকা আশ্চর্য কিছু নয়। হাইতির অফিসিয়াল নাম হচ্ছে রিপাবলিক অব হাইতি। ক্যারিবিয়ান সাগর বিধৌত এই দেশটি কিউবা ও জ্যামাইকার পূর্বে এবং বাহামা দীপপুঞ্জের দক্ষিণে হিস্পানিওলা দ্বীপে অবস্থিত। প্রতিবেশী দেশ ডোমিনিকান রিপাবলিকের সংগে হাইতির ২৩৪ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং এই দু’টি দেশ হিস্পানিওলা দ্বীপকে ভৌগলিকভাবে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। হাইতির প্রধান ভাষা দু’টি, ফরাসী এবং ক্রিওল। ফরাসী ভাষার অস্তিত্ব সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল কিন্তু ক্রিওল ভাষার নাম অনেকের কাছেই নতুন মনে হতে পারে। ক্রিওল ভাষার সংগে ইংরেজি ভাষার মিল সবচেয়ে বেশী থাকলেও এটি মূলত অনেকগুলো ভাষার সংমিশ্রণে একটি মিশ্র ভাষা।

ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার দিক থেকে ১৪১টি দেশের মধ্যে হাইতির অবস্থান হচ্ছে ১৩৮ তম যা অতি সহজেই বুঝিয়ে দেয় হাইতি একটি অত্যন্ত দরিদ্র রাষ্ট্র। নব্বুইয়ের প্রথমদিকে চাকরীর সুবাদে দু’বছর সপরিবারে দক্ষিণ আমেরিকার গায়ানাতে থাকার সময় হাইতির অনেকের সংগেই আমার পরিচয় হয়, তখন হাইতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়। গায়ানাকে অনেকেই ক্যারিবিয়ান দেশও বলে থাকেন এর ভৌগলিক অবস্থানের কারণে। পরবর্তীতে আমেরিকায় জাপানের একটি বিশ্বখ্যাত ইলেক্ট্রনিক্স কোম্পানির আইটি বিভাগে কাজ করার সময় প্রায় চৌদ্দ বছর আগে ডুমন্ড এস্টিমে নামে আমার এক সহকর্মীর সঙ্গে পরিচয় হয় যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা হাইতিতে কিন্তু কর্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তার কাছে হাইতি সম্পর্কে আরো অনেক কিছু জানার সুযোগ হয় দীর্ঘ আট বছর একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে। তবে ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারির রিখটার স্কেলের ৭ মাত্রার মাত্র ৩০ সেকেন্ড স্থায়ী ভূমিকম্পে যখন হাইতি পুরোপুরি বদলে যায়, তখন এর বিস্তারিত ইতিহাস জানতে আরো বেশী আগ্রহী হয়ে পড়ি। হাইতির জনসংখ্যা ১১ মিলিয়ন যার মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগই আফ্রিকান এবং বাকী শতকরা ৫ ভাগ অন্যান্য জনগোষ্ঠী।

হাইতির জনগণ সাধারণভাবে খুব দয়ালু ও অতিথিপরায়ণ কিন্তু দেশটি চরম দারিদ্র্যপীড়িত বলে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার অন্ত নেই। এই অবস্থায় ২০১৬ সালে অপেক্ষাকৃত তরুণ জোভেনেল মোইজ (জন্ম ১৯৬৮ সালে) প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। সাংবিধানিকভাবে ২০১৯ সালে হাইতির পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক সমস্যার কারণে তা আর হয়নি এবং প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইজ তার শাসনকার্য ডিক্রির মাধ্যমে চালিয়ে যেতে থাকেন। বিরোধী দল ও জনতার একটি অংশ জোভেনেলের পদত্যাগ দাবী করতে থাকে এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশের মতোই জ্বালাও-পোড়াও অব্যাহত থাকে। হাইতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা বা অন্যান্য বিষয়ে বিস্তারিতভাবে এ নিবন্ধে তুলে ধরা সম্ভব নয়, উদ্দেশ্যও নয়, কিন্তু মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে উপরের বিবরণের মাধ্যমে হাইতির একটি সামগ্রিক চিত্র পাঠকের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে নৃশংসভাবে। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা দেশে উপস্থিত না থাকায় দুর্ঘটনাক্রমে বেঁচে যান এবং তাঁর প্রথমা কন্যা শেখ হাসিনা বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু হাইতির প্রেসিডেন্ট জোভেনেলের পরিবারের অন্য কেউ নিহত হননি, শুধুমাত্র তার সহধর্মিণী মার্টিন মেরি এটিয়েন জোসেফ মোইজ গুরুতর আহত হয়েছিলেন এবং আমেরিকার মায়ামিতে কয়েক সপ্তাহের চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন। তাদের একমাত্র কন্যা তার এক ভ্রাতার কক্ষের ক্লজেটে লুকিয়ে থেকে নিজেকে রক্ষা করেন এবং দুই ছেলে বাইরে থাকায় তারাও বেঁচে যান।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর একটি বিপথগামী দল, এমনকি শিশু রাসেলকেও রেহাই দেয়নি তারা। সেনাবাহিনীর ট্যাংক এবং অন্যান্য সব ধরণের সামরিক সরঞ্জাম সহকারে ব্যারাক থেকে জনপথে সদর্পে অনুশীলনের ভাণ করে ভোর রাতে তারা বঙ্গবন্ধুর বাসভবন আক্রমণ করে সবাইকে হত্যা করে। মূল হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী সেনাসহ তাদের সহযোগী সেনা এবং মদদ দানকারী ঊর্ধ্বতন সেনা কর্তৃপক্ষের সদস্যের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও তা যে কমপক্ষে ৩

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *